দীপিকা যে কারণে পুলিশের জেরার মুখে !

17

বিনোদন ডেস্ক : অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর ঘটনায় বলিউড তারকা দীপিকা পাডুকোনকে ভারতের মাদক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক দফতর নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই ঘটনায় যে ৬ জনকে তলব করা হয়েছে দীপিকা পাডুকোন তাদের একজন। শনিবার এই একই তদন্তে আরো দুজন অভিনেত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সুশান্ত সিং রাজপুতের গার্লফ্রেন্ড রিয়া চক্রবর্তীকে এর আগে এ মাসের শুরুতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে তিনি সুশান্ত সিং রাজপুতের জন্য মাদক কিনেছিলেন। কিন্তু এই অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।

এই মামলাটি ভারতের গণমাধ্যমে গত কয়েক মাস ধরে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে এবং নানা রকম জল্পনা চলছে। শনিবার অন্য যে দু’জন অভিনেত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তারা হচ্ছেন সারা আলি খান এবং শ্রদ্ধা কাপুর। এর আগে শুক্রবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় আরেকজন অভিনেত্রী রাকুল প্রীত সিং-কে। ৩৪ বছর বয়স্ক সুশান্ত সিং রাজপুতকে গত ১৪ই জুন মুম্বাইতে তার ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সে সময় পুলিশ বলেছিল তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সুশান্ত সিং রাজপুতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়।

এতে বলা হয় তিনি এই আত্মহত্যায় এবং অন্য কিছু অপরাধে প্ররোচনা দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ রিয়া চক্রবর্তী অস্বীকার করেন। ভারতের তিনটি কেন্দ্রীয় সংস্থা এখন এই মামলার তদন্ত করছে। তবে এসব তদন্তের খুব ছিটেফোঁটা তথ্যই গণমাধ্যম জানতে পারছে। ফলে আদতে কী ঘটেছিল এবং তাতে কারা জড়িত ছিল তা নিয়ে গুজব এবং জল্পনা ব্যাপক রূপ নিয়েছে।

মামলা কী নিয়ে : ভারতের নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড দুটি তদন্ত নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এর একটি রিয়া চক্রবর্তী, তার ভাই এবং রাজপুতের বাসার সাবেক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে। এদের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সুশান্ত সিং রাজপুতকে গাঁজা সেবনে সহায়তা এবং গাঁজা জোগান দেয়ার অভিযোগে। তবে তারা এরকম কোন কাজে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় তদন্তটি চলছে বলিউডের তারকাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে মাদকের ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে। এসব তদন্তের ব্যাপারে কর্মকর্তারা কোন তথ্য জানাচ্ছেন না। যার ফলে এই তদন্ত নিয়ে রহস্য আরো বেশি দানা বাঁধছে। সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই সবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে রিয়া চক্রবর্তীর ওপর। তাকে ঘিরে অনেক অভিযোগ আর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে।

এই ঘটনার তদন্তে নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ডের কর্মকর্তারা হোয়াটসঅ্যাপে চালাচালি করা মেসেজ পরীক্ষা করে দেখছেন। হোয়াটসঅ্যাপের এসব মেসেজে নাকি রিয়া চক্রবর্তী মাদক নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন। ভারতে মারিজুয়ানা সেবন অবৈধ। তবে এটি থেকে তৈরি করা আরেকটি মাদক, যা ভারতে ভাং নামে পরিচিত, সেটি নেয়া বৈধ এবং বহু মানুষ এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এই ঘটনার সঙ্গে দীপিকা পাডুকোনের সম্পর্ক কোথায় এটি খুব পরিষ্কার নয়।

নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট করার সময় পাডুকোন এবং তার ম্যানেজার যে সব কথাবার্তা বলেছেন তার সূত্র ধরেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। স্থানীয় গণমাধ্যমে এরকম খবরই বেরিয়েছে। তবে এসব মেসেজে ঠিক কী আছে সেটা স্পষ্ট নয়।

অনেকে বলছেন দীপিকা পাডুকোনকে টার্গেট করা হয়েছে, কারণ তিনি গত জানুয়ারি মাসে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের এক বিক্ষোভ দেখতে গিয়েছিলেন। এই ছাত্রদের উপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থক ছাত্ররা হামলা করেছিল। বিজেপির সর্মথকরা অবশ্য দাবি করছেন দীপিকা পাডুকোন তার নতুন চলচ্চিত্রের জন্য প্রচার পাওয়ার লোভে এসব করছেন। বিজেপি এই ছবিটি বর্জন করার জন্য লোকজনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল।

টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকাটি জানাচ্ছে, তদন্ত কর্মকর্তারা যে সমস্ত মাদক ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, তারা কয়েকজন অভিনেত্রীর নাম বলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে প্রশ্ন তুলছেন এই তদন্তে কেবলমাত্র অভিনেত্রীদেরই কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, কেন অভিনেতাদের নয়। কজন অভিনেতার মৃত্যুর বিষয় নিয়ে যে তদন্তের শুরু, সেটি এখন একেবারেই ভিন্ন একটি রূপ নিয়েছে।

বলিউডের অনেক নামকরা তারকাই যখন এই মামলায় মনোযোগের কেন্দ্রে, তখন মামলাকে ঘিরে মিডিয়ার মাতামাতি এখন একেবারে লাগামহীন হয়ে পড়েছে। এই খবরটিই এখন ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

এ নিয়ে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে : কিছু টেলিভিশন চ্যানেল যেরকম আক্রমনাত্মক ভঙ্গিতে এই ঘটনার খবরা-খবর দিচ্ছে সেটা রীতিমত হাস্যকর রূপ নিয়েছে। সুশান্ত সিং রাজপুতের আশেপাশের যারা ছিলেন, কয়েক মাস ধরে মিডিয়া তাদের কাউকেই রেহাই দেয়নি। তার চিকিৎসক, বন্ধু, সহকর্মী, পরিবার- এমনকী তার সাবেক বাবুর্চিকে পর্যন্ত খুঁজে বের করা হয়েছে ইন্টারভিউ এবং এক্সক্লুসিভ রিপোর্টের জন্য।

যেহেতু তদন্তের ব্যাপারে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছেনা, তাই যেটুকু সামান্য তথ্য পাওয়া গেছে বা যেটুকু তথ্য ফাঁস হয়েছে নিউজ চ্যানেলগুলো তার বিশ্লেষণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চালিয়েছে। রিয়া চক্রবর্তী যে রাজপুত সিং এর অর্থকড়ির ব্যাপারে জড়িত ছিলেন সেটা প্রমাণ করার জন্য একটা টেলিভিশন চ্যানেল তার ফোনের মেসেজ পর্যন্ত বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন।

একজন অনুষ্ঠান উপস্থাপক একটা মেসেজের প্রতি ইঙ্গিত করেন, যেখানে ‘ইমা বাউন্স’ বলে একটা কথা ছিল। এই উপস্থাপক কথাটার মানে ব্যাখ্যা করেন এই বলে যে, এর মানে হচ্ছে একটা বাউন্স হওয়া চেক। এই ব্যাখ্যা সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকজনের বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন দ্রুতই জানান, ইমা বাউন্স কথাটি ব্যবহার করেন একেবারে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা। ‘আই এম গোয়িং টু লিভ’ কথাটার বিকল্প হিসেবে তারা ইমা বাউন্স কথাটি বলে থাকেন।

এই ঘটনাটি মিডিয়া যেভাবে কভার করেছে সেটা নিয়ে রীতিমত হাসাহাসি চলছে। অনলাইনে এ নিয়ে অনেক মিম শেয়ার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চলছে গণমাধ্যমের তীব্র সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই মামলাটি নিয়ে গণমাধ্যম যে পরিমাণ সময় ব্যয় করেছে সেটা ভারতের সামনে এখন যেসব জ্বলন্ত সমস্যা, তা থেকে নজর ভিন্ন দিকে সরিয়ে দিয়েছে কিনা। কোভিড-১৯ সংক্রমণের দিক থেকে ভারত এখন বিশ্বে দুই নম্বর অবস্থানে। ভারতের অর্থনীতি এখন মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের এখন মারাত্মক অবনতি ঘটছে। আর ঠিক এরকম একটা সময়ে ভারতের গণমাধ্যম মেতে আছে এই ঘটনা নিয়ে।