তীব্র গরমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম জনপদ পানি সঙ্কটে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : পানি নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে র্দীঘ অপেক্ষা। এমনই চিত্র এখন বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ-পশ্চিমের জনপদ গোটা কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার উপকূলজুড়ে। এখানে মাঠের পর মাঠ এখন শুধু ধু ধু বালুচর। খাল-বিলে পানি নেই। ২/৩ মাসের মধ্যে বৃষ্টি না হওয়ায় পানির অধিকাংশ উৎসগুলো শুকিয়ে গেছে। নলকূপে পানি ঠিকমতো উঠছে না। ভূগর্ভস্থ পানির স্থর নিচে নেমে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর চারদিকে পানি আর পানি, কিন্তু তা সবই লবণাক্ত। উপকূলের কিছু কিছু এলাকার দু-একটি গভীর নলকূপে দীর্ঘ সময় ধরে হ্যান্ডেল চেপে যতসামান্য পানি উঠলেও তাও লবণাক্ত। পানের উপযোগী একফোঁটা পানির জন্য রীতিমতো চলছে হাহাকার।

দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় এবং পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৬৩৮টি গভীর ও ৩৫৮টি অগভীর নলকূপ ছাড়াও ৩৯৭টি ভিএইচএসটি, ৪৮৩টি এসএসটি, ১০৯৮টি আরডব্লিউএইচ এবং ৫৬৬টি পিএসএফ এর মাধ্যমে স্থানীয়দের আর এখন পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, নীলডুমুর, গাবুরা, পদ্মপুকুর, ভেটখালি, কৈইখালি, নলখাগড়া, তালবাড়িয়া, কুটিকাটা, কাঁঠালবাড়িয়া, কাছিহারানি, কাশিপুর, হেঞ্চি, আটুরিয়া, ছোটকুপোট আশাশুনির প্রতাপনগর, শ্রীউলা, বলাবাড়ীয়া, শ্রীউলা এবং কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়াশিমলা ও মথুরেশপুর, হাড়ৎদাহসহ আশপাশের অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি তীব্র খাবার পানির সঙ্কট চলছে।

দেশের সর্বদক্ষিণ-পশ্চিমের জনপদ সাতক্ষীরার উপকূলজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় তীব্র বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। নলকূপে ঠিকমতো উঠছে না পানি। পানের উপযোগী একফোটা পানির জন্য সর্বত্র চলছে হাহাকার। বৈশাখের তীব্র তাপদাহে বিশুদ্ধ খাবার পানির উৎসের খোঁজে উপকূলবাসীকে কলস হাতে মাইলের পর মাইল পথ ছুটতে হচ্ছে। কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার প্রায় ৬ লাখ মানুষ তীব্র সুপেয় পানির সঙ্কটে রয়েছে।

প্রতিদিনই মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের আওতায় জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ৬ হাজার লিটার বিশুদ্ধ সুপেয় পানি উপকূলবাসীকে সরবরাহ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। এ কারণে উপকূলবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তীব্র তাপদাহে দুই কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে কলস নিয়ে দুর্গাবাটি সাইক্লোন সেল্টার থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহ করতে এসেছেন তাপসি মন্ডল। তিনি জানান, ভাত রুটি না খেয়ে একবেলা থাকা যায়, কিন্তু পানি না খেলে এক মুহূর্ত জীবন কাটে না।

তারই পাশে দাঁড়িয়ে পানি নিতে আসা পঞ্চাশোর্ধ্ব মালেকাবানু বিবি বললেন, ৫ মাস ধরে কোনো বৃষ্টি নাই। খাবার পানির অধিকাংশ পুকুরগুলো শুকিয়ে গেছে। রোজার মধ্যে বাধ্য হয়ে ৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কিছুদিন আগেও হুলা গ্রামের নঈম সাহেবের শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের কর্দমাক্ত দুর্গন্ধ পানি বাধ্য হয়ে খেতে হয়েছে। আরডব্লিউএইচ, পিএসএফসমূহ যথযথভাবে কাজ না করায় সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা লির্ডাস এর সহায়তায় দুর্গাবাটি সাইক্লোন সেল্টারে পানি সংগ্রহ করতে আসা তাপসি মন্ডল ও কতবানুর মতো পায়ে হেঁটে আরও ৩ থেকে ৪ গ্রামের শত শত মানুষ এসেছেন সুপেয় পানি নিতে। সবার সঙ্গে কলস।

এ অবস্থায় সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. আরশাদ আলী জানান, জেলায় গভীর-অগভীর নলকূপ, ভিএসএসটি, এসএসটি, পিএসএফ, রেইন ওয়াটার হারবেসটিংসহ মোট ৪৩৯৮১টি সুপেয় পানির উৎস রয়েছে। এর মধ্যে আশাশুনিতে ৬৫১১টি এবং শ্যামনগরে রয়েছে ৫৪৫১টি। তিনি বলেন, বিশেষ করে উপকূল অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২৫ থেকে ৩০ ফুট নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর ও অগভীর নলকূপগুলোতে পানি উঠছে না। অধিকাংশ আরডব্লিউএইচ, পিএসএফ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে দেশের দক্ষিণের এই জনপদে তীব্র সুপেয় পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে বৃষ্টি হলে কিছুটা সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

এলাকাবাসীর ভাস্যমতে, কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার প্রায় ৬ লক্ষ মানুষ তীব্র বিশুদ্ধ খাবর পানি সঙ্কটে রয়েছে। এদিকে গত ২১ এপ্রিল থেকে সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ মোবাইল ওয়াটার টিটমেন্ট প্লান্টের আওতায় ৬ হাজার লিটার বিশুদ্ধ সুপেয় পানি উপকূলবাসীকে সরবরাহ করে যাচ্ছে। সেটি অবশ্য প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে জানায় এলাকাবাসীর। উপকূলবাসীর খাবার পানির সমস্যা দীর্ঘদিনের। সাতক্ষীরা জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্রমতে, ২০১৮ সালে খাবার পানি নিয়ে উপকূলবাসীর সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় পুকুর, দীঘি, জলাশয় ও পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

এক একটি পুকুরের ব্যয় ধরা হয় ১৯ লাখ থেকে ৬৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। যার অংশ হিসাবে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জেলা পরিষদের ৪৭টি পুকুর খনন করে পিএসএফ দেয়া হয় খবার পানির জন্য। পুকুরগুলোর পূর্বকার পাড় হতে ১৮ ফুট গভীর হওয়ার কথা ছিল। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, খননকৃত প্রতিটি পুকুর পাড়ের ওপর ২/৩ ফুট মাটি ফেলে গভীরতা অক্ষুণ্ণ রাখে। ফলে খননকাজে শুভঙ্করের ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ ওঠে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও সংশিলিষ্ট অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে। যার কারণে খননকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন কাঠালবাড়ীয়া গ্রামের অনিল মন্ডল, সুধংশু মন্ডল ও আব্দুর রশিদসহ আরো অনেকেই।