প্রিন্স ফিলিপের ৯৯ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ডিউক অব এডিনবারা, যাকে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত স্বামী বলা হচ্ছে। শুক্রবার তিনি ৯৯ বছর বয়সে মারা গেছেন। তিনি জীবনের সাতটি দশক কাটিয়েছেন তার স্ত্রী, যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ছায়ায়। তবে তার ছিল এমন এক ব্যক্তিত্ব, যে কারণে তাকে কেবল একজন স্বামী বলে বর্ণনা করা ঠিক হবে না। ডিউক, যিনি প্রিন্স ফিলিপ নামেও পরিচিত ছিলেন, কখনোই আসলে রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারের লাইনে ছিলেন না। তার বড় ছেলেই রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী। প্রিন্স ফিলিপ কখনোই রাজার উপাধি ধারণ করেননি। কারণ, যুক্তরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী, একজন নারী যদি রাজাকে বিয়ে করেন, তিনি আলংকারিকভাবে রানি উপাধি পান, কিন্তু একজন পুরুষ যখন সিংহাসনে থাকা রানিকে বিয়ে করেন, তিনি কখনো রাজার উপাধি ব্যবহার করতে পারেন না। যিনি সিংহাসনে আসীন সত্যিকারের রাজা, এই উপাধি কেবল তার।

জীবনের শুরু : প্রিন্স ফিলিপের জন্ম ১৯২২ সালের ১০ই জানুয়ারী গ্রিসের এক দ্বীপ কর্ফুতে। তিনি ছিলেন গ্রীসের প্রিন্স এ্যান্ড্রু এবং ব্যাটেনবার্গের প্রিন্সেস এলিসের কনিষ্ঠতম সন্তান এবং একমাত্র পুত্র। বাবা-মায়ের দিকের এই বংশধারার ফলে তিনি ছিলেন একইসঙ্গে গ্রিস এবং ডেনমার্কের রাজকুমার। কিন্তু এর পরের বছরেই গ্রিসে এক অভ্যুত্থানের পর তাদের পরিবার সেদেশ থেকে বিতাড়িত হয়। ফিলিপের শৈশব ছিল কিছুটা ছন্নছাড়া, একের পর এক বিয়োগান্তক ঘটনার পরিণামে। ১৯৩০ সালে, যখন তার বয়স মাত্র ৮ বছর, তখন তার মাকে মানসিক রোগীদের এক চিকিৎসা কেন্দ্রে রাখা হয়, কারণ তার একের পর এক নার্ভাস ব্রেকডাউন হচ্ছিল।

প্রিন্স ফিলিপ: ৯৯ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন
এর পরবর্তী বছরগুলোতে ফিলিপ তার বাবা-মাকে কমই দেখেছেন। তার বাবা এক প্রেমিকাকে নিয়ে চলে যান ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরাতে। তার মায়ের দিকের আত্মীয়রা এসময় ফিলিপের লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। পরে তিনি তাদের মাউন্টব্যাটেন নামই যুক্ত করেন নিজের নামের শেষে। ব্যাটেনবার্গ নামটিই ইংরেজিতে হয়ে যায় মাউন্টব্যাটেন। তার কৈশোর কেটেছে স্কটল্যাণ্ডের এক বোর্ডিং স্কুলে। এটির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান শিক্ষক ছিলেন ইহুদী শিক্ষাব্রতী কার্ট হান। নাৎসীদের নিন্দা করায় জার্মানি থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এই স্কুলটি ফিলিপের জীবনকে একটা ছাঁচের মধ্যে নিয়ে আসলো, তাকে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করলো। স্কুলের নিয়মকানুন ছিল বেশ কড়া। সকালে ঘুম থেকে উঠতে হতো বেশ তাড়াতাড়ি এবং উঠেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় স্নান করতে হতো। এরপর দৌড়ের মতো নানা রকম শরীরচর্চা। প্রধান শিক্ষক কার্ট হানের ধারণা ছিল, বয়ঃসন্ধিকালের বিষাক্ত আবেগ ঠেকাতে এটা খুব প্রয়োজন।
১৯৩৭ সালে প্রিন্স ফিলিপের চার বোনের একজন, সিসিল এক বিমান দুর্ঘটনায় তার জার্মান স্বামী, শাশুড়ি এবং দুই সন্তান সহ মারা যান। সিসিল তার কিছু আগে নাৎসী পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন, যে দলটি পুরো জার্মান রাষ্ট্র পুরোপুরি তাদের কব্জায় নিয়ে গেছে। ফিলিপের বয়স তখন ১৬ বছর। ডার্মস্ট্যাড শহরের রাস্তা দিয়ে তার বোনের কফিনের পেছনে যখন তিনি হাঁটছিলেন, তখন দুপাশের জনতা ‘হেইল হিটলার’ স্যালুট দিচ্ছিল। প্রিন্স ফিলিপ পরে এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, তখন আসলে এটাই ঘটেছিল। “আমাদের পরিবার ভেঙে গেছে, আমার মা ছিলেন অসুস্থ, আমার বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে, এবং আমার বাবা তখন ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে। আমাকে এই সবকিছু মেনে নিতে হচ্ছিল।”
ফিলিপের সঙ্গে রানির পরিচয় : প্রিন্স ফিলিপ যখন স্কুল ছাড়লেন, তখন ব্রিটেনের সঙ্গে জার্মানির যুদ্ধ শুরু হওয়ার উপক্রম। তিনি ডার্টমুথের রয়্যাল নেভাল কলেজে যোগ দিলেন। সেখানে তিনি তার ক্লাসের সেরা ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষ করলেন। ১৯৩৯ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জ যখন সেখানে এক সরকারি সফরে গেলেন, তখন প্রিন্স ফিলিপের ওপর দায়িত্ব পড়লো রাজার দুই মেয়ে, প্রিন্সেস এলিজাবেথ এবং প্রিন্সেস মার্গারেটের দেখাশোনা করার।

তাদের গভর্নেস মেরিয়ন ক্রফোর্ড পরে তার স্মৃতিচারণে বলেছেন, তখন প্রিন্স ফিলিপ নিজেকে বেশ একটু জাহির করছিলেন। ১৩ বছর বয়সী প্রিন্সেস এলিজাবেথের মনে তিনি বেশ ভালো ছাপ রাখতে সক্ষম হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রিন্স ফিলিপ বেশ কৃতিত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। তিনি ভারত মহাসাগরে প্রথম বারের মতো লড়াই প্রত্যক্ষ করেন। ১৯৪২ সালের অক্টোবরে তার বয়স যখন মাত্র ২১ বছর, তখন তিনি রাজকীয় নৌবাহিনীর কনিষ্ঠতম এক ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট। কিশোরী রাজকুমারী এলিজাবেথ এবং নৌবাহিনীর অফিসার ফিলিপের মধ্যে পত্র-যোগাযোগ ছিল। ১৯৪৩ সালের ক্রিসমাসের সময়টা প্রিন্স ফিলিপ রাজপরিবারের সঙ্গে কাটান। এ সময় রাজকুমারী এলিজাবেথের টেবিলে শোভা পাচ্ছিল প্রিন্স ফিলিপের ইউনিফর্ম পরা ছবি। এর মাধ্যমে যেন তিনি তার মনের পছন্দ তুলে ধরছিলেন।কিন্তু রাজপরিবারের অনেকের মধ্যে সংশয় ছিল। অনেকে অবজ্ঞাভরে বলছিল, “প্রিন্স ফিলিপ বেশ রুক্ষ, ব্যবহার জানে না, অশিক্ষিত এবং সে স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে না।”

তবে প্রিন্স ফিলিপের জীবনীকার ফিলিপ এইডের মতে, ১৯৪৬ সালে যেসব চিঠি প্রিন্স ফিলিপ লেখেন, তাতে একজন উৎসাহী তরুণ যেন জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন এমন ধারণাই পাওয়া যায়। ডিউক অব এডিনবারাকে এখন থেকে রানির সঙ্গী বলে ঘোষণা করা হলো। তার প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে তার স্ত্রীকে সব কাজে সহযোগিতা-সমর্থন দেয়া। তবে প্রিন্স ফিলিপ চেয়েছিলেন রাজপরিবার তার নামের শেষাংশ, মাউন্টব্যাটেন ব্যবহার করুক। ১৯৫০ এর দশকে এটা নিয়ে বেশ দীর্ঘ বিতর্ক চলে। কিন্তু রানি এলিজাবেথ তার হাউস অব উইন্ডসরের নামই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।

সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ার : তাদের বিবাহিত জীবনের শুরুটা ছিল খুবই আনন্দঘন। এক সময় রয়্যাল নেভিতেও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তার কেরিয়ার, বিয়ের পর তার পোস্টিং হয় মাল্টায় কিন্তু এই জীবন খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তাদের প্রথম সন্তান প্রিন্স চার্লসের জন্ম হয় বাকিংহাম প্রাসাদে ১৯৪৮ সালে। তার দু’বছর পর ১৯৫০ সালে জন্ম হয় কন্যা প্রিন্সেস অ্যানের। ১৯৫০-এ নৌবাহিনীতে তরুণ ফিলিপ তার ক্যারিয়ারের তুঙ্গে। এ সময় রাজা ষষ্ঠ জর্জের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকায় তার কন্যাকে আরও বেশি করে রাজার দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়।

ফিলিপের তখন স্ত্রী এলিজাবেথের পাশে থাকা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। রানির অভিষেকের সময় রাজ পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় যে রানির পর সব কিছুতেই সবার আগে থাকবে ফিলিপের স্থান, কিন্তু সংবিধানে তার কোনো স্থান থাকবে না। রাজ পরিবারকে আধুনিক করে তোলার এবং জাঁকজমক সঙ্কুচিত করার অনেক চিন্তাভাবনা ছিল ডিউকের, কিন্তু প্রাসাদের নিয়মনীতির রক্ষক যারা ছিলেন, তাদের অব্যাহত বিরোধিতায় তিনি ক্রমশ উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

প্রিন্স ফিলিপ ও রাজপরিবার : গ্রিস থেকে যে তাদের পুরো পরিবারকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেটি প্রিন্স ফিলিপ কখনো ভুলতে পারেন নি। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজতন্ত্রকে টিকে থাকতে হলে ক্রমাগত খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তিনি এমন কিছু মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করলেন, যেখানে রানি সমাজের বিভিন্ন পটভূমির মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন।

ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা রাজভৃত্যদের মাথার চুল রঙ করার রীতি তিনি বন্ধ করলেন এবং তিনি যখন জানতে পারলেন যে, রাজপ্রাসাদে কেবল রাজপরিবারের সদস্যদের রান্নার জন্য দ্বিতীয় একটি রান্নাঘর চালু আছে, সেটি তিনি বন্ধ করে দিলেন। ১৯৬৯ সালে ‘রয়্যাল ফ্যামিলি’ নামে এক যুগান্তকারী টেলিভিশন ডকুমেন্টারি বেশ সাড়া ফেলেছিল। ডিউক এই টিভি ডকুমেন্টারির কাজে সহায়তা করেন। এতে দেখা গিয়েছিল, রানি তার ঘোড়াকে গাজর খাওয়াচ্ছেন, টিভি দেখছেন এবং বালমোরাল প্রাসাদের বারবিবিকিউ পার্টিতে সালাদ নিয়ে আলাপ করছেন, আর পাশে প্রিন্সেস অ্যান সসেজ রান্না করছেন।

 প্রাসাদের ফটকে ফুল রেখে প্রিন্স ফিলিপকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সাধারণ মানুষ

শেষ জীবন : ২০১১ সালের জুন মাসে, নব্বইতম জন্মদিনের সময় তিনি খুব খোলামেলাভাবেই তার বয়স বেড়ে যাওয়ার বাস্তবতার কথা স্বীকার করেছিলেন। প্রিন্স ফিলিপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো রাজ পরিবারকে ভেতরে ও বাইরে সমর্থন দিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে বিপর্যয়ের সময়। ব্রিটিশ ইতিহাসে রাজ পরিবারে রাজা বা রানির জীবনসঙ্গীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় বেঁচে ছিলেন প্রিন্স ফিলিপ।

১৯৯৭ সালে বিয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেওয়া ভাষণে রানি এলিজাবেথ তার স্বামীর প্রশংসা করে বলেছিলেন, সব সময়েই তিনি আমার শক্তি। আমি এবং তার গোটা পরিবার তার কাছে, তিনি যতোটা দাবি করেন বা যতোটা জানেন, তার চেয়েও অনেক বেশি ঋণী। প্রিন্স ফিলিপ শারীরিক অসুস্থতার কারণে লন্ডনের কিং এডওয়ার্ড হাসাপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৬ ফেব্রুয়ারি। পরে লন্ডনের সেন্ট বার্থলোমিউ হাসপাতালে তার পুরনো হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে তার সফল অস্ত্রোপচারও হয়েছিল। প্রায় এক মাস চিকিৎসার পর তিনি উইন্ডসর কাসেলে ফিরে যান। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।